মসলার যুদ্ধ : স্বর্ণের দামে বিক্রি হতো মসলা - bhalo lage
মসলার যুদ্ধ : মসলার দখলে সাম্রাজ্যের ইতিহাস
ইউরোপে মসলা শুধু খাবারের স্বাদ বৃদ্ধির জন্য নয়, বরং ওষুধ, সুগন্ধি, খাবার সংরক্ষণ ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। অভিজাত ও ধনীরা অতিথি আপ্যায়নে মসলাদার খাবার পরিবেশনকে সম্মান ও বিলাসের নিদর্শন মনে করত। ফলে এর বাজারদর সবসময়ই ছিল উচ্চ।
এছাড়া মসলা হাতবদল হতো একাধিক মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে। প্রথমে ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আরব বণিকদের কাছে, সেখান থেকে মিশর ও লেভান্ত, তারপর ভেনিস এবং অবশেষে ইউরোপীয় বাজারে পৌঁছাত। প্রতিটি স্তরে কর, শুল্ক আর লাভ যোগ হওয়ায় মসলার দাম ক্রমাগত বেড়ে যেত।
পরিবহন ব্যবস্থাও মসলার দাম বাড়িয়ে দিত। উৎপাদন কেন্দ্র থেকে ইউরোপ পর্যন্ত পণ্য পৌঁছাতে হতো হাজার হাজার কিলোমিটার সমুদ্র ও মরুভূমির পথ পেরিয়ে। সমুদ্রযাত্রায় ঝড়, জলদস্যু, দুর্গম বন্দর আর স্থলপথে মরুভূমি ও কর-শুল্কের কারণে ব্যয় হতো প্রচুর। প্রতিটি স্তরে নানা বিপদ আর খরচ যোগ হয়ে দাম হয়ে উঠত বহুগুণ।
মধ্যযুগ থেকে প্রারম্ভিক আধুনিক যুগ পর্যন্ত ইউরোপে মসলার চাহিদা ছিল আকাশচুম্বী। এর প্রধান কারণ ছিল উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা। দারুচিনি, লবঙ্গ, জয়ফল কিংবা গোলমরিচ এসব মসলা পৃথিবীর মাত্র কয়েকটি অঞ্চলে পাওয়া যেত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, লবঙ্গ আসত ইন্দোনেশিয়ার মালাক্কা দ্বীপপুঞ্জ থেকে, জায়ফল কেবল বান্দা দ্বীপে জন্মাত, আর গোলমরিচ পাওয়া যেত ভারতের মালাবার উপকূলে। এত সীমিত উৎস থেকে দূর ইউরোপে পৌঁছে দেওয়াই এগুলোকে বিরল ও মূল্যবান করে তুলেছিল।
কিভাবে পর্তুগিজরা প্রথম আরব সাগর-ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করে একচেটিয়া বাণিজ্য শুরু করল?
১৪৯৭ সালে ভাস্কো দা গামা লিসবন থেকে রওনা হয়ে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে প্রথমবার ভারত মহাসাগরে ঢোকে। ১৪৯৮ সালে সে কেরালার কালিকট বন্দরে পৌঁছায়। এটি ছিল ইউরোপ থেকে সরাসরি ভারতে যাওয়ার প্রথম সমুদ্রপথ।
ভারত মহাসাগরে তখন পর্যন্ত নৌযুদ্ধ ছিল না, বরং বাণিজ্য ছিল অনেকটাই মুক্ত। পর্তুগিজরা এলে তারা ক্যানন বসানো বড় বড় যুদ্ধজাহাজ ব্যবহার করে। তারা কালিকট, কোচিন, ক্যানানর, গোয়া, হরমুজ, মালাক্কা প্রভৃতি জায়গায় দুর্গ ও নৌঘাঁটি বানাতে শুরু করে। এসব জায়গা থেকে তারা পণ্য চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে।
১৫০২ সালের দিকে পর্তুগিজরা ঘোষণা দিল—ভারত মহাসাগরে চলতে হলে পর্তুগিজ লাইসেন্স নিতে হবে। প্রতিটি জাহাজকে তাদের কাছ থেকে কার্টাজ নামে একধরনের পাস কিনতে হতো। যার কাছে কার্টাজ থাকত না, তাদের জাহাজ জব্দ বা ধ্বংস করা হতো। এভাবেই তারা পুরো সমুদ্রপথের উপর নিয়ন্ত্রণ বসায়।
পর্তুগিজরা মূলত গোলমরিচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, জয়ফল একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে আনে। লিসবনের রাজকোষে মসলার বাণিজ্য থেকে বিপুল সম্পদ জমা হতে থাকে। প্রায় ষাট বছর ধরে (১৬শ শতকের প্রথম ভাগ) পর্তুগিজরা আরব, ভেনিস ও অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকদের সরিয়ে দিয়ে একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রাখে।
তাদের শাসন ছিল লুটপাট, দমননীতি আর ধর্মান্তর–চেষ্টায় ভরা। তাই স্থানীয় শাসক, আরব বণিক আর পরবর্তীতে ডাচ ও ইংরেজরা মিলে ধীরে ধীরে তাদের ক্ষমতা খর্ব করে। ১৬শ শতকের মাঝামাঝি থেকে পর্তুগিজ সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে যায়
.jpeg)