জমি বিষয়ক গাইড লাইন - bhalo lage



বাংলাদেশের জমি বিষয়ক সম্পূর্ণ গাইড: কেনা-বেচা থেকে রক্ষণাবেক্ষণ


যদি প্রশ্ন করেন, আমার দাদার/বাবার নামে কী কী জমি আছে তা দেখব কীভাবে?


১. অনলাইনে চেক করা

  ওয়েবসাইটে যান: eporcha.gov.bd বা land.gov.bd  এ গিয়ে ভূমি রেকর্ড ও ম্যাপ খতিয়ান দেখবেন।জেলা, উপজেলা, মৌজা, খতিয়ান নম্বর (যদি জানেন) দিন। CS, SA, RS, BS সব ধরনের খতিয়ান দেখা যায় (ফ্রি চেক, কপি নিতে টাকা লাগে)।

  অথবা dlrms.land.gov.bd বা settlement.gov.bd - খতিয়ান সার্চ।

২. অফলাইনে চেক করা

ইউনিয়ন ভূমি অফিস বা এসি ল্যান্ড অফিসে গিয়ে খতিয়ানের কপি নিন। দাদা/বাবার নাম দিয়ে সার্চ করলে একাধিক খতিয়ান আসতে পারে। সব দেখে নিন কোনটা আপনার।


এক খন্ড জমিতে কতটুকু অরিজিনাল মালিকের কতটুকু খাস জমি? কিভাবে বুঝবেন?

খতিয়ানে দেখে মালিকের নাম যদি দাদা/বাবা হয় সেটা রেকর্ডীয়/অরিজিনাল মালিকানা।

 খাস জমি মানে সরকারি জমি (খাস খতিয়ানে সরকারের নাম থাকে)। এটা কারও ব্যক্তিগত নয়, সরকারের। খাস জমি কিনে নেওয়া/বিক্রি করা অবৈধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ।

খতিয়ানে দাগ নম্বর দেখে মোট জমির পরিমাণ মিলিয়ে নিন। কোনো অংশ খাস হলে আলাদা উল্লেখ থাকবে।



খারিজ ও কবলা কী?

কবলা (সাফ কবলা): জমি কেনা-বেচার দলিল। এতে বিক্রেতা থেকে ক্রেতার নামে হস্তান্তর হয়।

খারিজ (নামজারি/মিউটেশন): দলিলের পর ভূমি অফিসে আবেদন করে খতিয়ানে নতুন মালিকের নাম লেখানো। এটা না করলে জমি আপনার নামে রেকর্ড হয় না।

অনলাইনে: mutation.land.gov.bd আবেদন করুন (দলিল নম্বর, তারিখ দিয়ে)



জমি কেনার ধাপসমূহ

জমি কেনা-বেচা একটা বড় প্রক্রিয়া। ভুল হলে পরে ঝামেলা হয়

১. জমির খতিয়ান, ম্যাপ, দলিল চেক করুন (eporcha.gov.bd)

২. মালিকানা যাচাই: খাস/বিতর্কিত কি না দেখুন

৩. দরদাম করে দাম ফাইনাল করুন

৪. বায়না দলিল (agreement) করুন (অগ্রিম টাকা দিয়ে)

৫. সাফ কবলা দলিল তৈরি করুন (লেখক/উকিল দিয়ে)

৬. সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করান (স্ট্যাম্প, ফি দিয়ে)

৭. রেজিস্ট্রির পর নামজারি/খারিজ করান (mutation.land.gov.bd)

8. খাজনা আপডেট করুন


জমি বিক্রির ধাপ

একই তবে ক্রেতার সাথে আলোচনা করে দলিল তৈরি করুন।

খরচ: রেজিস্ট্রেশন ফি  দলিল মূল্যের ২% + স্ট্যাম্প + VAT + অন্যান্য (মোট ৫-৮% হতে পারে, ২০২৫-২৬ সালে)। সঠিক হিসাবের জন্য fees.matirpathshala.com বা rd.gov.bd দেখুন।

কাগজপত্রের স্টেপ সাধারণত

- খতিয়ান - ম্যাপ - পুরনো দলিল - খাজনার রসিদ - NID - ছবি - দলিল লেখা - সাক্ষী - রেজিস্ট্রি - নামজারি।


জমির ট্যাক্স/খাজনা দেখব কীভাবে?

অনলাইনে ldtax.gov.bd তে নাগরিক লগইন/রেজিস্টার করুন।

  - খতিয়ান/দাগ/হোল্ডিং নম্বর দিয়ে চেক করুন।

  - বকেয়া/পেইড দেখা যাবে, অনলাইনে পেমেন্টও করা যায়।

অফলাইনে তফসিল অফিসে গিয়ে খাজনার রসিদ দেখান।


অতিরিক্ত টিপস (খুব জরুরি)

- জমি কেনার আগে উকিল/জমি বিষয়ে অভিজ্ঞ কাওকে দেখান।

- খাস জমি, বিরোধী জমি এড়িয়ে চলুন।

- সবসময় সর্বশেষ খতিয়ান নিন (নামজারি হয়েছে কি না চেক)।

- হেল্পলাইন: ১৬১২২ (ভূমি সেবা) কল করুন।






ভূমি বিষয়ক নিম্নের তথ্যাবলী প্রত্যেকেরই জানা উচিত

১. নামজারী বা মিউটেশন কাকে বলে?
ক্রয়সূত্রে/উত্তরাধিকার সূত্রে অথবা যেকোন সূত্রে জমির নতুন মালিক হলে নতুন মালিকের নাম সরকারি খতিয়ানভুক্ত করার প্রক্রিয়াকে নামজারী বলা হয়।
২. জমা খারিজ”কাকে বলে?
যৌথ জমা বিভক্ত করে আলাদা করে নতুন খতিয়ান সৃষ্টি করাকে জমা খারিজ বলে। অন্য কথায় মূল খতিয়ান থেকে কিছু জমির অংশ নিয়ে নতুন জোত বা খতিয়ান সৃষ্টি করাকে জমা খারিজ বলে।
৩. খতিয়ান কাকে বলে?
ভূমি জরিপকালে ভূমি মালিকের মালিকানা নিয়ে যে বিবরণ প্রস্তুত করা হয় তাকে “খতিয়ান” বলে।
খতিয়ান প্রস্তত করা হয় মৌজা ভিত্তিক। আমাদের দেশে CS, RS, SA এবং সিটি জরিপ সম্পন্ন হয়েছে। এসব জরিপকালে ভূমি মালিকের তথ্য প্রস্তত করা হয়েছে তাকে “খতিয়ান” বলে। যেমন CS খতিয়ান, RS খতিয়ান…
ভূমি জরিপ: CS, RS, PS, BS

৪. ভূমি জরিপ/রেকর্ড কাকে বলে?
আইনী সংজ্ঞা হচ্ছে, The Survey Act, 1875 এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী সরকারের জরিপ বিভাগ সরেজমিন জরিপ করে ভূমির মালিকানার যে বিবরণ
এবং নকশা তৈরী করে তাই রেকর্ড বা জরিপ। অর্থাৎ রেকর্ড বা জরিপ হচ্ছে মালিকানার বিরবণ এবং নকশার সমন্বয়। একটি ভূমির মালিক কে এবং তার সীমানা কতটুকু এটা ভূমি জরিপের মাধ্যমে নকশা/ম্যাপ নির্ণয় করা হয়। এই নকশা এবং ম্যাপ অনুসারে মালিকানা সম্পর্কিত তখ্য যেমন ভূমিটি কোন মৌজায় অবস্থিত, এর খতিয়ান নাম্বার, ভূমির দাগ নাম্বার, মালিক ও দখলদারের বিবরণ ইত্যাদি প্রকাশিত হয় যাকে খতিয়ান বলে। রেকর্ড বা জরিপ
প্রচলিতভাবে খতিয়ান বা স্বত্ত্বলিপি বা Record of Rights (RoR) নামেও পরিচিত। রেকর্ড বা জরিপের ভিত্তিতে ভূমি মালিকানা সম্বলিত বিবরণ খতিয়ান হিসেবে পরিচিত। যেমন CS খতিয়ান, RS খতিয়ান, ইত্যাদি। আমাদের দেশে পরিচালিত ভূমি জরিপ বা রেকর্ড গুলো হচ্ছে;
1. CS -Cadastral Survey
2. SA- State Acquisition Survey (1956)
3. RS -Revitionel Survey
4. PS – Pakistan Survey
5. BS- Bangladesh Survey (1990)

ক) সি.এস. জরিপ/রেকর্ড (Cadastral Survey)
“সিএস” হলো Cadastral Survey (CS) এর সংক্ষিপ্ত রূপ। একে ভারত উপমহাদেশের প্রথম জরিপ বলা হয় যা ১৮৮৯ সাল হতে ১৯৪০ সালের মধ্যে পরিচালিত হয়। এই জরিপে বঙ্গীয় প্রজাতন্ত্র আইনের দশম অধ্যায়ের বিধান মতে দেশের সমস্ত জমির বিস্তারিত নকশা প্রস্তুত করার এবং প্রত্যেক মালিকের জন্য দাগ নম্বর উল্লেখপুর্বক খতিয়ান প্রস্তুত করার বিধান করা হয়। প্রথম জরিপ হলেও এই জরিপ প্রায় নির্ভূল হিসেবে গ্রহণযোগ্য। মামলার বা ভূমির জটিলতা নিরসনের ক্ষেত্রে এই জরিপকে বেস হিসেবে অনেক সময় গণ্য করা হয়।

খ) এস.এ. জরিপ (State Acquisition Survey)
১৯৫০ সালে জমিদারী অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন পাশ হওয়ার পর সরকার ১৯৫৬ সালে সমগ্র পূর্ববঙ্গ প্রদেশে জমিদারী অধিগ্রহনের সিদ্ধান্ত নেয় এরং রায়েতের সাথে সরকারের সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে জমিদারদের প্রদেয় ক্ষতিপুরণ নির্ধারন এবং রায়তের খাজনা নির্ধারনের জন্য এই জরিপ ছিল।
জরুরী তাগিদে জমিদারগন হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই জরিপ বা খাতিয়ান প্রণয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল।

গ) আর.এস. জরিপ ( Revisional Survey)
সি. এস. জরিপ সম্পন্ন হওয়ার সুদীর্ঘ ৫০ বছর পর এই জরিপ পরিচালিত হয়। জমি, মলিক এবং দখলদার ইত্যাদি হালনাগাদ করার নিমিত্তে এ জরিপ সম্পন্ন করা হয়। পূর্বেও ভুল ত্রুটি সংশোধনক্রমে আ. এস জরিপ এতই শুদ্ধ হয় যে এখনো জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের ক্ষেত্রে আর, এস জরিপের উপর নির্ভর করা হয়। এর খতিয়ান ও ম্যাপের উপর মানুষ এখনো অবিচল আস্থা পোষন করে।

ঘ) সিটি জরিপ (City Survey)
সিটি জরিপ এর আর এক নাম ঢাকা মহানগর জরিপ। আর.এস. জরিপ এর পর বাংলাদেশ সরকার কর্তিক অনুমতি ক্রমে এ জরিপ ১৯৯৯ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে সম্পন্ন করা হয়। এ যবত কালে সর্বশেষ ও আধুনিক জরিপ এটি। এ জরিপের পরচা কম্পিউটার প্রিন্ট এ পকাশিত হয়।

৫. পর্চা কাকে বলে?
ভূমি জরিপকালে চূড়ান্ত খতিয়ান প্রস্তত করার পূর্বে ভূমি মালিকদের নিকট খসড়া খতিয়ানের যে অনুলিপি ভুমি মালিকদের প্রদান করা করা হ তাকে “মাঠ পর্চা” বলে। এই মাঠ পর্চা রেভিনিউ/রাজস্ব অফিসার কর্তৃক তসদিব বা সত্যায়ন হওয়ার পর যদি কারো কোন আপত্তি থাকে তাহলে তা শোনানির পর খতিয়ান চুড়ান্তভাবে প্রকাশ করা হয়। আর চুড়ান্ত খতিয়ানের অনুলিপিকে “পর্চা” বলে।
৬. মৌজা কাকে বলে?
যখন CS জরিপ করা হয় তখন থানা ভিত্তিক এক বা একাধিক গ্রাম, ইউনিয়ন, পাড়া, মহল্লা অালাদা করে বিভিন্ন এককে ভাগ করে ক্রমিক নাম্বার দিয়ে চিহ্তি করা হয়েছে। আর বিভক্তকৃত এই প্রত্যেকটি একককে মৌজা বলে

৭. তফসিল কাকে বলে?
জমির পরিচয় বহন করে এমন বিস্তারিত বিবরণকে “তফসিল” বলে। তফসিলে, মৌজার নাম, নাম্বার, খতিয়ার নাম্বার, দাগ নাম্বার, জমির চৌহদ্দি, জমির পরিমাণ সহ ইত্যাদি তথ্য সন্নিবেশ থাকে।

৮. দাগ নাম্বার কাকে বলে?
যখন জরিপ ম্যাপ প্রস্তুত করা হয় তখন মৌজা নক্সায় ভূমির সীমানা চিহ্নিত বা সনাক্ত করার লক্ষ্যে প্রত্যেকটি ভূমি খন্ডকে আলাদা আলাদ নাম্বার দেয়া হয়। আর এই নাম্বারকে দাগ নাম্বার বলে। একেক দাগ নাম্বারে বিভিন্ন পরিমাণ ভূমি থাকতে পারে। মূলত, দাগ নাম্বার অনুসারে একটি মৌজার অধীনে ভূমি মালিকের সীমানা খূটিঁ বা আইল দিয়ে সরেজমিন প্রর্দশন করা হয়।

৯. ছুটা দাগ কাকে বলে?
ভূমি জরিপকালে প্রাথমিক অবস্থায় নকশা প্রস্তুত অথবা সংশোধনের সময় নকশার প্রতিটি ভূমি এককে যে নাম্বার দেওয়া হয় সে সময় যদি কোন নাম্বার ভুলে বাদ পড়ে তাকে ছুটা দাগ বলে। আবার প্রাথমিক পর্যায়ে যদি দুটি দাগ একত্রিত করে নকশা পুন: সংশোধন করা হয় তখন যে দাগ নাম্বার বাদ যায় তাকেও ছুটা দাগ বলে।

১০. খানাপুরি কাকে বলে?
জরিপের সময় মৌজা নক্সা প্রস্তুত করার পর খতিয়ান প্রস্তুতকালে খতিয়ান ফর্মের প্রত্যেকটি কলাম জরিপ কর্মচারী কর্তৃক পূরন করার প্রক্রিয়াকে খানাপুরি বলে।

১১. আমিন কাকে বলে?
ভূমি জরিপের মাধ্যমে নক্সা ও খতিয়ান প্রস্তত ও ভূমি জরিপ কাজে নিযুক্ত কর্মচারীকে আমিন বলে।

১২. খাজনা ককে বলে?
সরকার বার্ষিক ভিত্তিতে যে প্রজার নিকট থেকে ভূমি ব্যবহারের জন্য যে কর আদায় করে তাকে খাজনা বলে।

১৩. দাখিলা কাকে বলে?
ভূমি কর/খাজনা আদায় করে যে নির্দিষ্ট ফর্মে ( ফর্ম নং১০৭৭) ভূমি কর/খাজনা আদায়ের প্রমান পত্র বা রশিদ দেওয়া হয় তাকে দাখিলা বলা হয়।

১৪. DCR কাকে বলে?
ভূমি কর ব্যতিত আন্যান্য সরকারি পাওনা আদায় করার পর যে নির্ধারিত ফর্মে (ফর্ম নং ২২২) রশিদ দেওয়া হয় তাকে DCR বলে।

১৫. কবুলিয়ত কাকে বলে?
সরকার কর্তৃক কৃষককে জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার প্রস্তাব প্রজা কর্তৃক গ্রহণ করে খাজনা প্রদানের যে অঙ্গিকার পত্র দেওয়া হয় তাকে কবুলিয়ত বলে।

১৬. খাস জমি” কাকে বলে?
সরকারের ভূমি মন্ত্রনালয়ের আওতাধিন যে জমি সরকারের পক্ষে কালেক্টর বা ডিসি তত্ত্বাবধান করেন এমন জমিকে খাস জমি বলে।


আরো বিস্তারিত জানতে নিচের বইগুলো পড়তে পারেন



সবশেষে বলবো নিজে জ্ঞান অর্জন এবং অভিজ্ঞ কারো পরামর্শ নিয়ে জমিজমা সংক্রান্ত কাজ করা।






Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url